• #
  • #
  • #

আঞ্চলিক গ্রামরক্ষী বাহিনী

সুখচর ঘোষপাড়া, থানা - খড়দহ, উঃ ২৪ পরগণা

কলকাতা - ৭০০১১৫

ঐতিহ্যমন্ডিত জনপদ সুখচর

সুখচরের ধর্মীয় ঐতিহ্য

  • সুখচর কালীতলা (শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা) :-

    এই গ্রামেরই গ্রাম্যদেবী শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা ঠাকুরাণী। পূর্বে জায়গাটি তুঁতগাছের জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।  রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করেন । ওই সময় শিব লিঙ্গটি পাওয়া যায় । তাই ‘তুঁতেশ্বর শিব’ নামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ও সিদ্ধেশ্বরী দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। পরে স্থানীয় গোবিন্দচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কোন এক পূর্বপুরুষ শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী কালিমাতার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করান। শিলালিপিতে  জানা যায় ১৯০১ সালে হেমাঙ্গনী দেবী এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন । মূর্তিটি নবরুপে প্রতিষ্ঠা করেন ভক্ত গোপালচন্দ্র দে ও তার পত্মী বিনোদিনী দাসী ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে। মন্দির অভ্যন্তরে কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি ও পদতলে রয়েছেন অর্দ্ধশায়িত অবস্থায় শ্বেতপাথরের শিব। ইতিহাস প্রসিদ্ধ সিদ্ধপীঠ সাধকের একান্ত কামনায় জ্যোতির্ময়ী। যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই দেবীতীর্থে পূজা অর্চনা। এই মূর্তিতে অনেক অলৌকিক কাহিনী বর্তমান। মায়ের মাহাত্ম্যে আপ্লুত এলাকার জনসাধারন। স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তায় পরবর্তীকালে মন্দিরের সামনে প্রশস্ত চাতাল ও নাটমন্দির তৈরী হয়। ১৯৪৪ সাল থেকে এখানে বারোয়ারী দুর্গাপূজা চালু হয়।

  • রাধাকান্ত মন্দির :-

    রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের গৃহদেবতা রাধাকান্ত বিগ্রহটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় এই গ্রামে অবস্থান করত । পরবর্তীকালে স্থানীয় গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামবাসীর সাহায্যে তার মাতা সুরিনী দেবীর ইচ্ছা অনুসারে ৮ই আগষ্ট, ১৯০৮ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের অভ্যন্তরে কষ্টিপাথরে তৈরী কৃষ্ণবিগ্রহ সহ অষ্টধাতু নির্মিত রাধামূর্তি নিত্য পূজিত হয়। এই মন্দিরটির অবস্থান সুখচর সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের সংলগ্ন।

  • পাইনদের বাগানবাড়ি ও রাধাকৃষ্ণ মন্দির :-

    সুখচর পঞ্চাননতলায় নরসিংহ দত্ত ঘাটের পার্শ্ববর্তী উত্তর প্রান্তে গঙ্গার তীরে প্রচুর বৃক্ষশোভিত এই বাগানবাড়ি। রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের পাশেই রাসমঞ্চ। সুখচরের পাইন বাড়িতে ১২৯০ বঙ্গাব্দের ১৯শে মাঘ শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দজীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বিহারী লাল পাইন ছিলেন কলিকাতা বন্দরের ক্লিয়ারিং এজেন্ট। কলিকাতা পুলিশের বর্তমান সদর কার্য্যালয় লালবাজারের বাড়িটি ছিল তাঁর গুদাম খানা। সমস্ত মাল জাহাজঘাটা থেকে এই গুদামে আসত। সেখান থেকে তা প্রকৃত মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। এই পাইনদের প্রধান বাস সুখচরে। মন্দির অভ্যন্তরে কষ্টিপাথরে নির্মিত কৃষ্ণ ও অষ্টধাতু নির্মিত রাধা ছাড়াও আছে নারায়ণ শিলা, গোপাল ইত্যাদি। বহিঃভাগের বামদিকে পাথরের করজোড়ে হনুমান মূর্তি এবং ডাইনে পদ্মাসনে উপবিষ্ট বুদ্ধমূর্তি। বুদ্ধমূর্তিটি খুবই প্রাচীন। এইরকম বুদ্ধমূর্তি খড়দহ / সুখচর / পানিহাটীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রচুর আছে। এখানেই তাঁরা সুদৃশ্য রাসমঞ্চসহ রাধাগোবিন্দ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। নিত্যসেবার পাশাপাশি  মন্দিরে পাইনদের বর্তমান বংশধরেরা রাসযাত্রা, মাকুড়ী সপ্তমী, জন্মাষ্টমী ও দোলপূর্নিমার দিন বিশেষ উৎসব সংগঠিত করেন। বিজলী আলো সরবরাহ না হওয়ার আগে এখানে প্রতি বছর জেনারেটর দিয়ে আলো জ্বালিয়ে যাত্রা ও অন্যান্য কীর্তনের অনুষ্ঠান হতো। বি.টি. রোড এ গীর্জার স্টপেজে নেমে গঙ্গারধারে পৌছলে এই রাধাকৃষ্ণ মন্দির পাওয়া যায়।

  • শ্রী গৌরাঙ্গ ও শ্রী নিত্যানন্দের প্রাচীন দারু-বিগ্রহ :-

    গোবিন্দ দত্ত - মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের দেবালয়ে সুখচরের গর্ব ও ঐতিহাসিক নিদর্শন এই বিগ্রহ। মহাপ্রভুর কীর্তনীয়া ছিলেন গোবিন্দ দত্ত। ৫০০ বছর পূর্বের ইতিহাস। পুরীতে রথযাত্রায় তিনি কীর্তনের মূলসঙ্গী ছিলেন। ইনি পদকর্তাও ছিলেন এবং পাখোয়াজ/খোল বাজাতেন। সুখচর গ্রামে শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীনিত্যানন্দের জীবদ্দশায় তাঁদের দারু প্রতিমূর্তি নির্মাণ করে গোবিন্দ দত্ত সেই দুটি মূর্তি সুখচরে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতেন। এখন ঐ দারু বিগ্রহদ্বয় মিলন সংঘ মাঠের দক্ষিন-প্রান্তে মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের দেবালয়ে পূজিত হচ্ছেন। গোবিন্দ দত্ত অবশ্য শেষ জীবনে বৃন্দাবনে বাস করতেন। বর্তমানে কীর্তনের পুণরায় জাগরনের সময় গোবিন্দ দত্তের অবদান বিশেষ উল্লেখ রাখে। আর উল্লেখযোগ্য বিষয় বর্তমান যুগের বিখ্যাত সাধক ও সঙ্গীতকার ভবাপাগলারও স্মৃতি এই ঠাকুর বাড়ির সঙ্গে জড়িত রয়েছে।মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের প্রধান কীর্তনিয়া গোবিন্দ দত্তের উল্লেখ বিশেষ করে শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রম্থে পাওয়া যায়।

  • আদিলীলা দশম পরিচ্ছেদঃ-

    প্রভুর কীর্তনীয়া আদি শ্রীগোবিন্দ দত্ত।। ৬২
    শ্রীবিজয় দাস নাম প্রভুর আঁখরিয়া(গ)।
    রামাই নন্দাই দোঁহে প্রভুর কিঙ্কর।
    গোবিন্দের সঙ্গে সেবা করে নিরন্তর।। ১৪১
    বাইশ ঘড়া(গ) জল দিনে ভরেন রামাই।
    গোবিন্দ আঞ্জায় সেবা করেন নন্দই।। ১৪২

    Govindananda and Govinda Datta, the twenty-fifth and twenty-sixth branches of the tree, were performers of kirtana in the company of Shri Chaitanya Mahaprabhu. Govinda Datta was the principal singer in Lord Chaitanya’s kirtana party. (In the image: Sankirtana Movement).

    http://gaudiyahistory.iskcondesiretree.com/govinda-datta/

  • নতুন কালীবাড়ী মন্দির :-

    সুখচর কলুপাড়া রোড ধারে এগিয়ে ডানদিকে হরিপদ সাঁতরা রোড ধরে গঙ্গার নিকটে এই মন্দিরের অবস্থান স্থল। শ্রীশ্রী জ্যোঁতির্ময়ী কালী নামে খ্যাত এই মন্দিরটি ১৯০১ খৃষ্টাব্দে যতীন্দ্রমোহন ঘোষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এই মন্দিরটির অলংকরণ ভিন্ন ধরনের। শঙ্কুআকৃতির পঞ্চচূড়া বিশিষ্ট এই মন্দিরটি দেশী ও বিদেশী মিশ্রণে তৈরি। সম্মুখে আছে নাট মন্দির। মন্দিরের বিগ্রহ অষ্টধাতুর তৈরি রাধা-মাধব, গোপাল, শালগ্রাম শিলা সহ বিভিন্ন দেব দেবীর নিত্য পূজা হয়।  ভোলানাথ রুপী শিব পূজিত হচ্ছেন পৃথক মন্দিরের বৈষ্ণব ও শাক্ত উভয় রীতিতে বিভিন্ন উৎসবাদি পালন করা হয়। বর্তমানে চট্টোপাধ্যায় বংশ, বংশ পরম্পরায় এই মন্দিরের সেবাইত।

  • নরসিংহ দত্ত ঘাট :-

    সুখচর নরসিংহ দত্ত ঘাটের লাগোয়া এই ধাম পূর্বে মল্লিক বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। এইখানে আছে তিনটি শিব মন্দির – অত্যন্ত মনোগ্রাহী। এক সময়ে দূর দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই ধামে আসতেন বালক ব্রক্ষচারীর আকর্ষনে। রাম নারায়ন রাম সংকীর্তনে মুখরিত হয়ে উঠতো এই অঞ্চলটি। বর্তমানে অবশ্য সেই উন্মাদনা অনেক স্তিমিত।



  • সুখচর বারো মন্দির ঘাট :-

    সুখচরের দক্ষিণপ্রান্তে পানিহাটী অঞলের ভবানীপুরের হরিশচন্দ্র দত্ত ঘাটের পাশে ১২১৩ বঙ্গাব্দে নির্মিত এই বারোটি শিবমন্দির বাঙ্গালী ইঞ্জিনিয়ার নীলমনি মিত্র এবং স্যার বাডফোর্ড লেসলির পরিকল্পনানুসারে নির্মিত হয়। প্রতিটি মন্দিরেই নীলকন্ঠী কষ্টিপাথরের লিঙ্গ আছে।



  • শ্রীশ্রীভোলানন্দ মঠ :-

    সুখচরের উত্তর প্রান্তে খড়দহ পৌরসভার অন্তর্গত এই মঠ অবস্থিত। স্বামী ভবানন্দগিরি কর্তৃক ১৯১৩ সালে এই মঠ স্থাপিত হয়। মঠে কাশীশ্বর মহাদেবের মন্দির এবং শ্রীশ্রী ভোলানন্দ স্মৃতিমন্দির বিদ্যমান । ১৯২৯ সালে স্বামী ভোলানন্দগিরি হরিদ্বারে দেহবসানের পূর্বে ১৯২৮ সালে কাশীশ্বর মহাদেবের প্রতিষ্ঠা করেন । ভোলানন্দ স্মৃতিমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১৯৩৬ সালে । মঠ পরিচালিত হয় দায়িত্ব হরিদ্বারের মূল কার্যালয় থেকে । এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ।

  • কাঠিয়া বাবা আশ্রম সুখচর :-

    সুখচরের উত্তর প্রান্তে পঞ্চাননতলা ঘাট সংলগ্ন গঙ্গার তীরে এই আশ্রমটি অবস্থিত। এই আশ্রমটির প্রতিষ্ঠাতা ১০৮ স্বামী ধনঞ্জয় দাস কাঠিয়া বাবাজী । ১৯৬৪ সালে এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি নিম্বার্ক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। বর্তমান প্রধান ডঃ বৃন্দাবন বিহারী দাস মহারাজ আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পম্ন । দেশে ও বিদেশে ভারতের মানবিক আদর্শের সাহায্য প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত । বহু ভক্ত ও শিষ্য নিরন্তর পথ নির্দেশ ও অনুপ্রেরনা পেয়ে উপকৃত। অতি মনোরম পরিবেশে মন্দির সকলের আকর্ষনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে । রয়েছে গোশালা, পাঠাগার ও অতিথিশালা ও পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র । নিত্য পূজা ও আরতি অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন তিথিতে বিশেষ পূজা ও ভোগ উৎসব হয় ও দুর–দুরন্ত থেকে ভক্ত সমাগম হয় ।

  • ভবাপাগলা আশ্রম :-

    বর্তমান কালের বিখ্যাত সাধক ও সঙ্গীত রচয়িতা ভবাপাগলা। ভবাপাগলা সাধন সঙ্গীত আজ অনেক ভক্ত মানুষের অনুপ্রেরণা। সুখচরের উত্তর প্রান্তে গঙ্গার তীরবর্তী ক্যাম্পের ঘাটের কাছে সুখচর ভবাপাগলার আশ্রম। এই আশ্রম গড়ে উঠেছে ভবাপাগলার ইচ্ছানুসারে ইংরেজী ৫ই সেপ্টেম্বর, ১৯৮৩ পত্রে যা প্রকাশ পায়। এই আশ্রমের কর্নধার স্বামী সোমেশানন্দ গিরি মহারাজ। যিনি ছাত্রাবস্থা থেকে ভবাপাগলার নিত্যসঙ্গী এবং পাগলের জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তাঁর কাছেই কাটিয়েছেন। এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে ভবার ভবদারা মূর্তি, শিব, রাধাকৃষ্ণ, ভবাপাগলার মূর্তি। এছাড়াও রয়েছে একটি নাটমন্দির। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং অনেক ভক্ত সমাগম হয়। ভবাপাগলার মরমী সঙ্গীত অনুষ্ঠান মানুষকে আপ্লুত করে। ফাল্গুন মাসের শেষ শনিবার ভবাপাগলার নির্দেশিত বিশেষ শুভ দিন। ঐদিনে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। এই আশ্রমে দুর্গাপূজা নিষ্ঠাসহকারে পালিত হয়। অনেক কল্যান কর কর্মসুচী এবং ভবাপাগলার ভাবধারার প্রচার সারা বছর ধরে করা হয়।

    পথনির্দেশ :- ট্রেনযোগে – শিয়ালদহ – ব্যারাকপুর মেন লাইন খড়দহ স্টেশন নেমে রিক্সা ১০/১৫ মিনিটের পথ, অথবা সোদপুর স্টেশন হইতে সুখচর সন্মিলনী ক্লাব অটোরিক্সায়। গঙ্গা কিনারে ভবাপাগলার আশ্রম। বাসযোগে – শ্যামবাজার – ব্যারাকপুর (বি.টি. রোড) বাস রাস্তায় “সুখচর গীর্জা” অথবা “বলরাম হসপিটাল” স্টপেজে নেমে গঙ্গা কিনারে রিক্সায় ৭/৮ মিনিটের পথ ভবাপাগলার আশ্রম।

  • সাঁইবাবা মন্দির :-

    সুখচরে বি.টি. রোডের গীর্জা স্টপেজের পশ্চিমে এই মন্দিরটি বর্তমানে আকর্ষনের কেন্দ্র। এই মন্দিরে রয়েছে সাঁইবাবার মন্দির। অনেক মানুষ এই মন্দির দেখতে ও আরতি পূজা উপভোগ করতে দুরদুরান্ত থেকেও আসেন ।



  • সুখচরের প্রাচীন দুর্গাপূজা :-

    সুখচরের প্রথম দুর্গাপূজা নরসিংহ দত্ত ঘাট রোডে শেষ সীমানায় অবস্থিত মিত্তির বাড়ির দুর্গাপূজা। পূজোটি মিত্তির বাড়ির পুজো নামে খ্যাত ছিল। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো সেই পূজা মন্ডপের আজ আর কিছু দেখা যায় না। কালের নিয়মে সেই পূজামন্ডপের আজ আর কিছু নেই। অতীত সুখচরে দুর্গাপূজার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় স্বর্গীয় মতিলাল ঘোষের ‘সুখচরের আদ্য বিবরণ’ ডায়েরী থেকে ।
    প্রয়াত যদুনাথ ঘোষের বাড়ীতে সে সময় দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল। সুখচরের বাসিন্দা বনমালি শেঠের বাড়ীতেও দুর্গাপূজার সঙ্গে জগদ্ধাত্রী পূজা, রাস পূজা মহা সমারোহে অনুষ্ঠিত হতো। সঁত্যহরি নন্দী ও কালীশেঠের বাড়ীতেও দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়াও গোপাল চন্দ্র দে, দ্বারিকানাথ প্রামানিক, গোবিন্দ ঘোষ, গোপালচন্দ্র শেঠ প্রভৃতি সুখচরের বাসিন্দাদের বাড়ীতে অতীতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। কোনো কোনোও বাড়ীতে আজও দুর্গা দালান দেখা যায় । এদের মধ্যে দত্তদের পূজার দালান। হরি ভট্রাচার্য্য, খাঁ-দের বাড়ির পূজার দালান, মজুমদারদের পাকা দালান, কার্ত্তিক পাল, হরিসাধন সাঁতরার বাড়ীতেও পূজা পার্বন অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমানে দু’ একটি ছাড়া প্রায় সব পূজোই বন্ধ হয়ে গেছে।

    ১৮২৩ সাল বাংলা ১২৩০ সন পণ্ডিত নবীনচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় সুখচর ঘোষপাড়ায় দুর্গাপূজার পত্তন করেন। অতীতে এই পূজা একটি সাধারণ চালাঘরে অনুষ্ঠিত হত। পরবর্ত্তীকালে ঐ দুর্গাপূজার ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখার জন্য বর্তমানে ঐ পূজামণ্ডপ নতুনভাবে গ্রামবাসীরা নির্মাণ করেন। বর্তমানে এই পূজাটি সুখচরের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন দুর্গাপূজা।

    ১৯৩৬ সালে সুখচর ওরিয়েন্টাল জিমনাসিয়ামের মাঠে সার্বজনীন দুর্গাপূজা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে দুর্গামণ্ডপ গড়ে উঠেছে।

    ১৯৪৪ সাল বাংলা ১৩৫১ সুখচর কালীতলার মাঠে স্থানীয় গ্রামবাসীদের উদ্যোগে সার্বজনীন দুর্গাপূজা শুরু হয়। বর্তমানে ঐ পূজা সুখচর কালীতলার নাট মন্দিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যাঁরা এই পূজার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, তাঁরা সকলেই বর্তমানে প্রয়াত – পূর্ণব্রহ্ম শেঠ, মুরারী মোহন দে, কৃষ্ণচন্দ্র গুহ, সত্যহরি নন্দী, কুটীদা, গোপাল গঙ্গোপাধ্যায়, হারাধন গঙ্গোপাধ্যায়, রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

    ১৯৪৭ সাল সুখচর সবুজ সঙ্ঘের উদ্যোগে শুরু হয় সার্বজনীন দুর্গোৎসব। পূর্বে ঐ পূজা শতদল বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত হতো। বিদ্যালয় নির্মিত হবার পর ঐ পূজা ক্লাব প্রাঙ্গনে স্থানান্তরিত হয়।

    বর্তমানে আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সার্বজনীন দুর্গা পূজাগুলি হল – প্রতাপ সঙ্ঘ নরসিংহ দত্ত ঘাট রোড, আমরা সবাই বাজারপাড়া, সার্বজনীন সুখচর আঞ্চলিক গ্রামবাসীবৃন্দের পুজো ঘোষপাড়া ক্লাব প্রাঙ্গণ, মিলন সঙ্ঘ কলুপাড়া, শশার পুজো কলুপাড়া, প্রগতি সঙ্ঘ হরিশচন্দ্র দত্ত রোড, রাজারোড সার্বজনীন পুজো সুখচর কর্মদক্ষ চন্দ্রচূড় স্কুলের নিকট, আমবাগানের পুজো, সুখচর গীর্জার পুজো, বালক সঙ্ঘ কবিরাজ মোড়, সুখচর সন্মিলনী, ভোলাগিড়ির মঠ, ভবা পাগলার আশ্রম এবং অন্যান্য।

  • সুখচরের টেরাকোটা মন্দির ও প্রাচীন মূর্তি কি সেন বংশের নির্দশন?

    সুখচরের প্রাচীনতম টেরাকোটা মন্দির বুদ্ধমূর্তি ও অর্ধনারীশ্বর মূর্তি সুখচর মৌজায় গ্রামের উত্তর প্রান্তে সাপুড়িতলা বা দেউলপোতায় টেরকোটার তিনটি শিবমন্দির প্রায় ধ্বংসের মুখে। টেলিগ্রাফ পত্রিকার সৌজন্যে জানা যায় যে এই মন্দির তিনটির নির্মানকাজ প্রায় তিনশত বৎসর পূর্বে ১৭৩১ খৃঃ। নির্মান কর্তা রামকৃষ্ণ শেঠ। সুখচরের সম্ভ্রান্ত শেঠ-পরিবারের পূর্ব পুরুষ। ওনার বংশধর কেদার শেঠ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পড়েছেন। এই মন্দির তিনটির বাংলার আটচালা ধাঁচের ও টেরাকোটার কাজগুলিও অপূর্ব যা অবশিষ্ট রয়েছে। প্রত্যেকটি মন্দিরের বহির্ভাগে অপূর্ব টেরাকোটা কারুকার্য এবং জটিল নকশায় পরিপূর্ন কিন্তু এর অধিকাংশই আজ ধ্বংসের পথে, এর অধিকাংশই চুরি হয়ে গিয়েছে। মন্দিরের ভিতরের শিবলিঙ্গগুলির ও এখন কোন অস্তিত্ব নেই। ভালভাবে লক্ষ্য করলে টেরাকোটার তৈরি ড্রাগন, ময়ূর, সাপ, মানব সিংহের লড়াই ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর হয়।  বর্তমানে এই মন্দিরগুলির সামনের অংশ প্রায় দৃশ্যমান হয়না, সামনে বসতি গড়ে ওঠার জন্য। কিন্তু এই মন্দির তিনটি এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে এই অঞ্চলের প্রাচীন সম্পদশালী ঐতিহ্যের প্রতীক হিসাবে। বর্তমানে এই মন্দিরগুলির খুবই ভগ্নদশা। মহাদেবের জটার মত বটবৃক্ষ্যের ঝুরি গুলি এই মন্দিরের চূড়া জুরে নেমে এসেছে, যেন পরম স্নেহে এই প্রকৃতি এখনো এগুলিকে রক্ষা করে চলেছে। এই টেরাকোটা মন্দির তিনটির একটি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পাওয়া যায় কিংবদন্তি ফরাসি পরিচালক জেন রেনওয়্যার-এর পৃথিবী বিখ্যাত এবং ভারতবর্ষের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র ‘দা রিভার (The River, by Jean Renoir)’ –এ। এই রিভার চলচ্চিত্রটি ১৯৫১ সালের প্রথম প্রদর্শিত হয়। এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সহকারী হিসাবে আর এক কিংবদন্তি পরিচালক প্রয়াত সত্যজিৎ রায়ের আত্মপ্রকাশ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই চলচ্চিত্রে বাংলার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রকৃতি এবং নদীর এক অপূর্ব দলিল হিসাবে এখনো মানুষকে নাড়া দেয়। এই প্রসঙ্গে আঞ্চলিক ইতিহাসের বিশিষ্ট গবেষক খড়দহের শ্রী তাপস মুখপাধ্যায়ের গবেষনা এবং উদ্যোগ বিশেষ উল্লেখযোগ্য । ইংরেজী দৈনিক Telegraph পত্রিকায় বিশেষ প্রতিবেদন আছে ।

  • #

    এর পাশাপাশি আরও দুটি উল্লেখযোগ্য উন্নত ধর্মীয় সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যায়। এটি বর্তমানে স্বামী মহাদেবানন্দ স্কুল নির্মানের সময় শায়িত অবস্থায় একটি ১০ টন ওজনের প্রস্তর মূর্তির সন্ধান মেলে। এই স্থানটি পূর্বে শেঠেদের ছোট বাগান হিসাবে পরিচিত ছিল।

  • এরই অনতিদূরে পঞ্চানন তলায় কয়েকবছর আগে খনন কার্য করার সময় এক অপূর্ব অর্দ্ধনারীশ্বর মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। এটি সেন বংশ আমলের নিদর্শন হিসাবে অনেকেরই অনুমান। উপরে বর্নিত তিনটি প্রাচীন নিদর্শন প্রমান করে সুখচর ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে উন্নত জীবন ধারা ও ধর্মীয় সাংস্কৃতির প্রচলন ছিল। আনুমানিক ৬০০ বৎসর পূর্বে প্রথমে বৌদ্ধ সংস্কৃতি, পরবর্তীকালে সেন বংশ আমলে অর্দ্ধনারীশ্বর মূর্তি ও তারও পরে শৈব সংস্কৃতির পরম্পরার ধারা লক্ষ্য করা যায়। এই তিন ভিন্ন প্রকার সভ্যতার ক্রমবিকাশের পরিচয় হলেও – একটি ব্যাখ্যার সম্বন্ধে ধারনা করা যায় যা এই অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতীক। এই সময়কালে এই অঞ্চলে একদিকে যেমন টেরাকোটা শিল্প ও ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রসার লাভ করেছিল তেমনি চিনির উৎপাদন ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি হওয়ার ফলে ব্যবসা-বানিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল ফলে এই অঞ্চলের আর্থিক সমৃদ্ধি ঘটে। তারই প্রতিফলন এই ধরনের মন্দির ও সংস্কৃতি।

  • সুখচরের প্রচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে অনেক মানুষের অবদান। সমগ্র গ্রাম ছিল এক পরিবারের মত। সন্ধ্যে হলেই পাড়ার বড়দের শাসন ছিল বাড়িতে গিয়ে লেখাপড়া করতে। অনাত্মীয় হলেও তাদের অনুশাসনের বিরুদ্ধে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। বর্তমানে ইঁট - সিমেন্ট ও বহুতলের বাড়ীতে অনেক মানুষ এক সাথে থাকলেও আন্তরিকতার স্থান যেন অনেক শিথিল হয়ে এসেছে। পূজার সময়ে যেন সেই দূরত্ব অনেকটা মুছে সবাই একসঙ্গে আনন্দ উপভোগের আস্বাদন করতে উদগ্রীব।

    পুরানো দিনের ঐতিহ্যগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই হারানো অতীত সম্পদ – যাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের প্রজন্মর দিক নির্দেশ হতে পারে।

    সুখচরের বামপ্রান্তে পানিহাটি ও ডানপ্রান্তে খড়দহের পূণ্য মাহাত্মের মাঝে এক অনুচ্চারিত ঐতিহ্য যেন বামে বলরাম ও ডাইনে জগন্নাথের আশ্রয়ের মাঝে ভগিণী সুভদ্রার অবস্থান।

  • মহাপ্রভুর মন্দির

    শ্যামসুন্দ্ররজীউর মন্দিরের উত্তরে কিছু দূরে খড়দহ শহরের মধ্যে একটি বৃহৎ ইষ্টক নির্মিত নবরত্ন মন্দিরে শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীনিত্যানন্দ ও জগন্নাথদেবের দারুময় মূর্তি এবং কৃষ্ণ-রাধিকার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। ইহা মহাপ্রভু- মন্দির নামে খ্যাত। মহাপ্রভুর মন্দিরে নিত্য পূজা ব্যতীত আষাঢ মাসে রথযাত্রা, মাঘী শুক্ল এয়োদশী তিথিতে শ্রীনিত্যানন্দের আবির্ভাব এবং ফাল্গুনী পূর্ণিমায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

  • রাধাবৃন্দাবনচন্দ্রজীউর মন্দির

    গোস্বামীপাড়ায় দক্ষিণমুখী সমতল ছাদ বিশিষ্ট একটি ঘরে রাধাবৃন্দাবনচন্দ্রজীউ নামে খ্যাত রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এবং ষড়ভুজ গৌরাঙ্গ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। কৃষ্ণ মূর্তিটি কষ্টি পাথরের, রাধিকা ধাতুময়ী এবং ষড়ভুজ গৌরাঙ্গের দারুময় মূর্তি। নিত্য পূজা ব্যতীত বৈশাখী পূর্ণিমায় ফুলদোল, শ্রাবণে ঝুলন, ভাদ্রে জন্মাষ্টমী, কার্তিক পূর্ণিমা রাসযাত্রা, মাঘী পূর্ণিমায় উৎসব এবং ফাল্গুন মাসে দোলযাত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। মন্দিরের নিকটে রাসখোলা রোডের উপর রাধাবৃন্দাবনচন্দ্রজীউ অষ্টকোনাকৃতি উচ্চ রাসমঞ্ঝ আছে । ফুলদোল ও রাসযার উপলক্ষে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহদ্বয়কে উক্ত রাসমঞ্ঝে স্থাপন করিয়া উৎসব পালন করা হয়। উক্ত মন্দির ও রাসমঞ্ঝটি ‘বিড়াল জনকল্যান ট্রাষ্ট’ কর্কৃক ইংরাজী ১৯৬৮ সালে সংস্কৃত হইয়াছে।

  • কৃতজ্ঞতা স্বীকার :-

    সোমেশানন্দ, নির্মল ঘোষ (বিধায়ক, পানিহাটী ও মুখ্য সচেতক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার), স্বপন ঘোষ (পৌরপ্রধান, পানিহাটী পৌরসভা), তাপস পাল (পৌরপ্রধান, খরদহ পৌরসভা), রামব্রহ্ম শেঠ, তাপস মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্র দাস, লোকনাথ ঘোষাল, পরমেশ্বর বন্দোপাধ্যায়, শ্যামব্রহ্ম শেঠ, সাধন চট্টোপাধ্যায়, কৃশানু ভট্টাচার্য্য, গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়, হৃষিকেশ ঘোষ, প্রভাত বিশ্বাস, কালীদাস মুখার্জী, রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জ্জী, দীপক কুমার নাগ, ডাঃ দেবীপ্রসন্ন ঘোষাল, ডাঃ উমাপ্রসন্ন ঘোষাল, প্রসূন চৌধুরী, ডাঃ শক্তিপদ মুখার্জী, ডাঃ সন্মথ ঘোষ, ডাঃ দেবদাস সাহা, অজয় ঘোষ, সুনিল রায়, গোবিন্দলাল শেঠ, সুভাষ নন্দী, হেরম্ব চক্রবর্তী, মলয় মিত্র, শৈলেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী, প্রসূন মুখার্জি, পাঁচুগোপাল সাধুখাঁ, সুভাষ সিনহা, রথীন্দ্রনাথ কুন্ডু, তপন শেঠ, স্বপন চৌধুরী, জুলী সরকার, সুভাষ গাঙ্গুলী, স্বপন দাস, স্বপন গাঙ্গুলী, প্রবীর চ্যাটার্জী, বিশ্বজিৎ কুন্ডু, প্রদীপ বোস, তরুন শেঠ, অমিতাভ পোদ্দার, খগেন্দ্রনাথ সাঁতরা, শম্ভুনাথ ঘোষ, মানিকলাল চক্রবর্তী এবং সুখচরের গ্রামবাসীবৃন্দ।
    আলোকচিত্র সৌজন্যে :- তাপস সরকার, চিন্ময় রায়, সুদীপ্তা শেঠ, সুদীপ্ত পাত্র, দেবজ্যোতি শেঠ, পবিত্র নন্দী, অভিষেক ভট্টাচার্য্য। সহযোগিতায় – DRS Tech – এর কর্মীবৃন্দ।

#

আঞ্চলিক গ্রামরক্ষী বাহিনী

সুখচর ঘোষপাড়া, উঃ ২৪ পরগণা

কলকাতা - ৭০০১১৫

Designed by © DRS Tech