• #
  • #
  • #

আঞ্চলিক গ্রামরক্ষী বাহিনী

সুখচর ঘোষপাড়া, থানা - খড়দহ, উঃ ২৪ পরগণা

কলকাতা - ৭০০১১৫

ঐতিহ্যমন্ডিত জনপদ সুখচর

সুপ্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত গ্রাম সুখচর। ভাগীরথীর পূর্বতীরে উত্তর ২৪ পরগণার অন্তর্গত বারাকপুর মহকুমার অধীন খড়দহ থানার প্রেক্ষাপটে সুখচর এক অতি প্রাচীন জনপদ। এই জনপদটি পানিহাটী পৌরপ্রতিষ্ঠানের অর্ন্তভুক্ত। উত্তর প্রান্তে সুখচর মৌজার কিছু অংশ খড়দহ পৌরসভারও অন্তর্গত। কলকাতা থেকে প্রায় ১৪ কিমি উত্তরে সোদপুর স্টেশনে বা খড়দহ স্টেশনে নেমে এই গ্রামে আসার অটোর ব্যবস্থা আছে।

সোদপুর স্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে অটো স্ট্যান্ড রয়েছে। সুখচর বাজারপাড়া অটো ধরে রাজা রোড দিয়ে বাজারপাড়া গঙ্গা সংলগ্ন বাজারপাড়া ঘাটের নিকট স্টপেজ। অপর রুটটি সুখচর সন্মিলনী অটো ধরে গির্জার রাস্তা দিয়ে সন্মিলনী স্টপেজ।

১৪৯৫ খৃষ্টাব্দে মনসা মঙ্গল কাব্যে ভাগীরথী পূর্ব্ব পশ্চিমের গ্রাম বা জনপদের সঙ্গে সুখচর গ্রামের উল্লেখ রয়েছে। চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যতরী রাজঘাট, রামেশ্বর পার হয়ে সাগর সঙ্গমের দিকে অগ্রসর হবার সময় পথে যে গ্রামগুলি পড়েছিল তার উল্লেখ রয়েছে। “পথে পড়িতেছে, অজয় নদী, উজানী, শিবানদী (বর্তমানে শিয়ালনালা), কাটোয়া ইন্দ্রানী নদী – ইন্দ্রঘাট, নদীয়া ফুলিয়া, গুপ্তিপাড়া, মির্জাপুর, ত্রিবেণী, সপ্তগ্রাম, কুমারহাট, ডাইনে হুগলী, বামে ভাটপাড়া, পশ্চিমে বোরো, পূর্বে কাঁকিনাড়া, তারপর মূলাজোড়া, গারুলিয়া, পশ্চিমে পাইকপাড়া, ভদ্রেশ্বর, ডাইনে চাঁপদানি, বামে ইছাপুর, বাকিবাজার, ডাইনে নিমাইতীর্থ (বর্তমানে বৈদ্যবাটি) চাণক, মাহেশ (বামে) খড়দহ, শ্রীপাট, ডাইনে রিসড়া (রিষড়া), বামে সুখচর, পশ্চিমে কোন্নগড়, ডাইনে কোতরং, বামে কামারহাটি, পূর্বে আড়িয়াদহ (এড়েদহ) পশ্চিমে ঘুষুড়ি, তারপরে পূর্বকূলে চিত্রপুর (চিৎপুর) কলিকাতা, পশ্চিমকূলে বেতড়) তারপর (বামে) কালীঘাট, চাড়াঘাট, ছত্রভোগ, বদরিকাকুন্ড, হাতিয়াগড়, চৌমুখী, শর্তমুখী এবং সর্বশেষে সাগর সংগমতীর্থকার্য শ্রাদ্ধ কৈল পবিত্র তর্পন’।

বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক শ্রী সাধন চট্টোপাধ্যায়ের থেকে আমরা জানতে পারি, ইংরাজ রাজত্ব কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভাগীরথীর উভয় তীরবর্তী গ্রামগুলি ধীরে ধীরে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে বেশী মাত্রায়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী জমিদারী ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর সুখচর শোভাবাজারের রাজ পরিবারের জমিদারীতে পরিগণিত হয়েছিল । এই পরিবারের রাজা নবকৃষ্ণ দেববাহাদুর ও পরবর্তী বংশধর রাজা রাধাকান্ত দেববাহাদুরের উল্লেখ বাংলার ইতিহাস দেখা যায়।

গুড় থেকে চিনি উৎপাদনের ব্যস্তসমস্ত কেন্দ্র তখন সুখচর। কলের সাদা চিনি আবিষ্কার হয়নি । কাশীর বিশ্বেশ্বরের নিত্য পুজো থেকে বাণিজ্যিক ভাবে বাটাভিয়া (ইন্দোনেশিয়া) পর্যন্ত সুখচরের লালচিনির কদর । গঙ্গা তীরের এই ব্যবসা তখন গমগম করছে। বাণিজ্যকেন্দ্রের পাশে নদীর তীর ঘেষে মস্ত অট্ট্টালিকা নির্মাণ করেন রাধাকান্ত। সুড়ঙ্গ দিয়ে গঙ্গাজল প্রবেশ করানো হত। পরিবারের লোকজনের স্নানের ব্যবস্থার আড়াল ছিল এ ভাবেই। জমিদার পরিবারের প্রতি সম্মান জানাতে, তারই তালুকদার, সোদপুরবাসী ঈশ্বরচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের বাড়ির পাশে একটি ঘাট নির্মাণ করান। চাঁদনি – সহ এই ঘাটটি চলতি নাম ‘বাজারপাড়ার ঘাট’। চাঁদনির গায়ে পঙ্খের নানা কারুকার্য ছিল। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে গুড়, ধান ও চিতলমাছ বহন করে প্রচুর নৌকা ভিড়ত এখানে, এই ঘাট থেকেই রাধাকান্ত দেব বাহাদুর ১৮৬৩ সালে বৃন্দাবন রওনা দেন এবং ওখানেই তার দেহান্ত হয়। ইংরেজ রাজত্বের প্রথম দিক থেকেই এই জনপদ ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জমিদারদের কাছাড়ী বাড়ির কাছে বড় ধরনের বাজার গড়ে ওঠা। পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলির জন্য এই বাজারে বহু ধরনের নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিষ ও খাদ্যদ্রব্য আমদানী ও রপ্তানী হতে থাকে। আগে যে হলুদ রঙের মিহি চিনি পূজোয় লাগতো তা সরবরাহ হত এইখান থেকেই। একসময় সুখচর ছিল পূর্বভারতের অন্যতম বৃহৎ চিনি উৎপাদন কেন্দ্র। আজও বারানসীর ঘাটে সুখচরের চিনি নামে সেই ধরণের চিনি তৈরী হয়। মূলতঃ আখের রস জ্বাল দিয়ে এই চিনি তৈরী হতো। তাই একে লাল চিনিও বলা হতো

সুখচর সুখের চর ছিল কিনা তা জানা না গেলেও এটি প্রমাণিত যে এই গ্রাম একসময় দেশী চিনি বা শর্করা তৈরীর জন্য বিখ্যাত ছিল। তার থেকেই শুকচর শব্দটির উৎপত্তি। চিনির মিষ্ট স্বাদের জন্য সুখের অনুভূতি হয়। সুখচরের নামকরণের যথার্থতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেকেই বলছেন চিনি তৈরীর কেন্দ্র ছিল বলেই একে সুখচর বলা হয়ে থাকে। আবার অন্যমতে ভাগীরথীর চরে সুখী পরিবারদের বসতি হওয়ায়, লোক মুখে স্থানটি পরিচিত হয় ‘সুখচর’/সু নামে। আবার কারও মতে ভাগীরথীর শুকনো চরে গড়ে ওঠার ফলে স্থানটির নাম হয় ‘শুকচর’।

আঞ্চলিক ইতিহাসের বিশিষ্ট গবেষক শ্রী কৃষানু ভট্টাচার্যের বই "পানিহাটি পরিক্রমা" থেকে উল্লেখ্য, " শ্যামব্রক্ষ শেঠ চিনি তৈরীর বিষয়ে কিছু তথ্য জানিয়েছেন। তার মতে, পুকুরের তলার এক ধরণের বিশেষ ঘাস আখের রস জ্বাল দেওয়ার সময় মিশিয়ে দেওয়া হতো। বিশাল মাপের লোহার কড়াইতে আখের রস জ্বাল দেওয়া হতো। মূলতঃ তারই পূর্বপুরুষ রাম শেঠ আনুমানিক চারশো বছর আগে সুখচরের গঙ্গার ধারে চিনি তৈরীর কারখানা তৈরী করেন। পরবর্তীকালে তার বংশধর বনমালী শেঠ, কেদার শেঠ ও কালী শেঠ একাদিক্রমে চিনি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিলেন। চিনি তৈরীর পাশাপাশি শেঠেরা চালও তৈরী করতেন। বর্তমানে সুখচর বাজার ঘাটের কাছে শেঠদের একটি বাড়িতে এ ধরনের একটি ধানকলও ছিল। চিনি তৈরী হতো চারটি কারখানাতে। তবে তিঁয়রপাড়া মাঠের কাছে এদের একটি বাড়িতে এখনও চিনি জ্বাল দেবার সারিবদ্ধ উনুনের নির্দশন ও বিশাল কড়াই অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে। মূলতঃ ১৯৩৩ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে কালী শেঠ প্রয়াত হন। এদিকে বাজারে রাসায়নিক চিনির প্রচলন হতে থাকায় দেশী চিনির ব্যবসাও সংকটে পড়ে। শেঠ পরিবার ছাড়াও ডঃ নীলমনি চ্যাটার্জ্জী, সাঁতারা পরিবার, নাগ পরিবারসহ গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়িতে দেশী চিনি তৈরী হতো। কিছুদিন আগে পর্যন্তও সুখচরের কালীতলার মঙ্গল গুই-এর মিষ্টির দোকানে বছরের বিভিন্ন সময়ে এই লাল চিনি তৈরী হোত। চিনি শিল্প ছাড়াও সুখচরে ধান, চাল, তেল, কাপড়ের বস্ত্র উল্লেখযোগ্য। যাতায়াতের সুবিধার জন্য অনেক দূর থেকেও এইখানে আসতেন জিনিসপত্র কেনার জন্য।"

নদীপথে বা জলপথে সুখচরের অবস্থানের সুবিধা এবং পূর্ববঙ্গের যাতায়তের সুবিধার জন্য এখানে বিভিন্ন পণ্যের বাজার গড়ে ওঠে। ব্যবসা বানিজ্যের কারণে সুখচরের জনবসতির একটি সুষম সমম্বয় গড়ে উঠেছিল বলে মনে হয়। যেমন কলু পাড়া, তেয়র পাড়া, কাঁসারী পাড়া, বাজার পাড়া, ঘোষ পাড়া, মিত্র পাড়া, পঞ্চাননতলা, সাপুড়ী তলা ইত্যাদি। নৌকা এবং পরবর্তীকালে লঞ্চ তৈরীর (গীতা গাঙ্গুলী) কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত হয়। এখানে তেয়র পাড়ায় সারি সারি নৌকার দৃশ্য, গঙ্গায় মাছ ধরার স্মৃতি এবং গঙ্গায় নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতার উন্মাদনা এখনো বয়স্ক মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সুখচরের ফুটবল ক্রীঢ়া, যাত্রা অনুষ্ঠান, নাচ-গান ও পূজা পার্বণে গ্রামবাসী একত্রিত উদযাপন উল্লেখযোগ্য। চারিদিকে গাছপালা,জলাশয় এবং নদীর তীরবর্তী শোভা কলকাতার অনেক মানুষকে আকর্ষিত করে এবং একাধিক বাগানবাড়ী ও আশ্রম গড়ে ওঠে।

পানিহাটি সোদপুর খড়দহ অঞ্চলে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের প্রভাব বাংলা তথা ভারতের শিল্পায়নে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই অঞ্চলে সুখচরে শেঠ পরিবারের জমিতে গড়ে উঠেছিল অনেক শিল্প যেমন কুসুম ইঞ্জিনিয়ারিং, বিটি রোডের ধারে সোদপুর পটারিস, বেরী ব্রাদার্স, মর্ডান ইঞ্জিনিয়ারিং। ক্যালকাটা সিল্ক মিল এবং পরবর্তী কালে হিন্দুস্থান ওয়ার ইত্যাদি। এইগুলির অধিকাংশই আজ বন্ধ হয়ে গেছে।

শিক্ষাব্যবস্থা

সংস্কৃতিবান ও শিক্ষানুরাগী জমিদার রাজা রাধাকান্ত দেববাহাদুরের উৎসাহে সুখচরে “টোল” প্রতিষ্ঠিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই । তার নিদর্শন ও সাক্ষ্য বর্তমান । উপরে উল্লেখিত শতাব্দীর শেষভাগে সুখচরে হিতৈষণী বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব লক্ষিত হয় স্টেট্সম্যান পত্রিকার একটি সংবাদ থেকে ১৮৯৬ সালের ১৩ই অক্টোবর স্টেট্সম্যান  সংবাদপত্রে একটি প্রকাশিত হয়। সংবাদটি এখানে উল্লেখিত।

The weather is fine but the heat is still intense. We expect fine weather during the Puja days. Then vernacular Scholarship examination commenced on 30th ultimo and 2nd instant. 4 students appeared from Khardah M.V. School, 4 from Panihati M.V. School and 3 from Sukchar Hitaisani School......

এছাড়াও সুখচরে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য স্বর্গীয় নলিনদেব বিশ্বাস, যার অবদান সুখচর গ্রামে স্বরণীয়। নলিন দেব বিশ্বাস-এর বাড়ি সুখচর নরসিংহ দত্ত ঘাট রোডে অবস্থিত ছিল শেঠের বাড়ি দালানের পূর্ব প্রান্তে। এই বাড়িতে এবং নিকটবর্তী পঞ্চাননতলায় শেঠেদের আর একটি বাড়ির পূজার দালানে মেয়েদের বিদ্যালয় শিক্ষা কেন্দ্র ছিল। বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে বিদেশিনী ইংরেজ মহিলা শিক্ষিকারাও এখানে পড়াতেন।

Vernacular Scholarship এর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যেই ১৯০৩ সালে সুখচর শিবতলা বঙ্গ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের গৃহ নির্মাণে প্রয়াত ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র শেঠ মহাশয়ের দান ও বদান্যতা বিদ্যালয়ের ফলকে উল্লেখিত আছে। স্মৃতি নির্ভর যাঁদের নাম পাওয়া যায় শেঠ মহাশয় ছাড়াও প্রয়াত শরৎচন্দ্র চ্যাটার্জী ও কালিপ্রসন্ন ঘোষাল মহাশয়রা এই বিদ্যালয়ের গোড়া পত্তনের সময় ও পরে যুক্ত ছিলেন। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে প্রয়াত জীবন কৃষ্ণ দাস, নলিনীকান্ত বল এবং অমূল্য মাইতির অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

পানিহাটী পৌরসভার ১৯০১ সালের আদমসুমারী অনুযায়ী লোকসংখ্যা ছিল ১১,০০০। ৬টি মূলগ্রামে এই সংখ্যা ছিল বিভক্ত। ভাগীরথীর উপকূলে জনসংখ্যা বেশী বলে হাজার দুয়েক মত ছিল বলে অনুমান করা হয়। ১৯০০ সাল থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে ক্লাব, বিদ্যালয় ও পাঠাগার গড়ে ওঠে। এককভাবে ঐ সব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের চিন্তাভাবনা না করে একই পৃষ্টপোষক ও সংগঠক একই সমাজভুক্ত সকল শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন গোষ্ঠীই উদ্যোগী হতেন। এই যুক্তির সারবত্তা প্রমাণ পাওয়া যায় অগ্রণী মানুষগুলির নামগুলি যদি পরীক্ষা করে দেখি প্রথম দিকের তিন দশক পর্যন্ত। বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে শিবতলা বিদ্যালয় ও পাঠাগারের জন্য জমি হস্তান্তরের দলিলে দেখা যায় সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ীর সেবাইতদের পক্ষে জমিটি দানের ক্ষেত্রে যাদের বিশেষ ভূমিকা ছিল তাঁরা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শশধর তরফদার, কালীপদ শেঠ, যতীন্দ্রনাথ ঘোষাল, সত্যহরি নন্দী, বনমালী দে প্রমুখ। এঁরা সকলেই পর্যায়ক্রমে ঐ সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ইহা ব্যতীত ঐ দশকের শেষ দিকে আর একজন সংগঠকের নাম উল্লেখ না করলে অপূর্ণ থেকে যায়।তিনি হলেন প্রয়াত নলিন দেব বিশ্বাস মহাশয়। পরবর্তী কালে বিদ্যালয় পরিচালনায় আরো যাঁদের নাম স্মরণীয় তাঁরা হলেন – প্রয়াত যতীন্দ্র নাথ ঘোষাল, দাশুরথী সেন, কৃষ্ণচন্দ্র চক্রবর্তী,কুঞ্জবিহারী বিশ্বাস, কিশোরী লাল মিত্র, হরিচরণ ব্যানার্জী, হৃষিকেশ ঘোষ, ভূপতি চ্যাটার্জী, বটকৃষ্ণ শেঠ, সতীশ চন্দ্র দাস ও জগৎব্রহ্ম শেঠ।

পঞ্চাশের দশকে বিদ্যালয়ের পরিচালক সমিতির বিশেষ চেষ্টায় সুখচর বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য সমিতির সহঃ সম্পাদক প্রয়াত জগৎব্রহ্ম শেঠ মহাশয়ের পিসিমার বাড়িটি যাহা তিনি বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেন। ৮/১০ কাঠার উপর চারটি ঘর সমেত বাড়ীটি পেয়ে সুখচর বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্টিত হয়। পিসীমার বাড়ি দানের ক্ষেত্রে আরও যাদের অবদান রয়েছে তাদের কথা না উল্লেখ করলে অসম্পূর্ণ থাকে তাঁরা হলেন পিসীমা গৌরী দাসী যিনি বিধবা হয়েছিলেন ১১ বছর বয়সে এবং মাতা দূর্গারানী শেঠ যিনি বিধবা হয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সে ।

সুখচরের উল্লেখযোগ্য উচ্চ বিদ্যালয়গুলি হল:- সুখচর কর্মদক্ষ চন্দ্রচুড় উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সুখচর শতদল বালিকা বিদ্যালয় (উচ্চ মাধ্যমিক), সেন্ট জেভিয়ার্স ইনস্টিটিউশন।

সুখচর গ্রামের পাঠাগারঃ

সুখচর গ্রামের পাঠাগারের গোড়াপত্তন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে ইংরাজি ১৯০৪ সালে বাংলা ১৩১১ সাল। তখন এর নাম ছিল ইয়ংমেন্স্‌ লিটারেরি অ্যাসোসিয়েশন। কলকাতা শিক্ষার পীঠস্থান। তার ঢেউ এসে লাগল সুখচরের কয়েকটি কিশোরের মনে। একটা কিছু করা দরকার। যার মধ্য দিয়ে জনসেবা, শিক্ষার প্রসার ঘটানো সম্ভব। স্থির হল গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা। ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার কাজ শুরু হল, চেয়ে চিন্তে সংগ্রহ হল রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু আরোও বই চাই। চাই অর্থ। নিজেদের উদ্যোগে কেনা হল নতুন পুরানো বই, পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করতে। এই সব উৎসাহী কিশোরদের পাশে এসে প্রথম যিনি দাঁড়িয়েছিলেন গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি স্বর্গত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরের বছর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের যুগে পুলিশ এল পাঠাগারে। পাওয়া গেল বোমা তৈরির ফরমুলার কাগজপত্র। তছনছ হল বইপত্র। সরকার বিরোধী চিহ্নিত নিষিদ্ধ বইগুলি সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। পুলিশের জুলুমের পর যে বই বেঁচে রইল তাই নিয়ে পাঠাগার পুনরায় কাজ শুরু করল কার্তিক চন্দ্র পালের বাড়িতে। ‘অনুশীলন সমিতি’ যোগাযোগ করে পাঠাগারের সভ্যদের সঙ্গে। লাঠিখেলা, ছোরা খেলার পাঠ চলে দিনের পর দিন। এর পর পাঠাগার স্থানান্তরিত হল কালীপদ শেঠ-এর বৈঠকখানা ঘরে ও পরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেউরির দোতলায়। সময়টা ১৯১৯ সাল। নিজস্ব বাড়ি নির্মাণের জন্য চলল অর্থ সংগ্রহ। কালীতলায় নির্মিত হল একতলা গৃহ। এই নির্মাণ কাজে বিনোদিনী দে একখন্ড জমি দান করেন । এছাড়া এই কর্মযজ্ঞের অংশীদার ছিলেন ডাঃ গোপাল চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণদাস নাগ এবং গ্রামবাসীরা। এদের উদ্যোগে বাড়ি নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। এই বাড়িতে সকালে/দুপুরে বসতো সুখচর বঙ্গবিদ্যালয় নামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। রাত্রে চলতো পাঠাগারের কাজকর্ম। শশধর তরফদার যিনি এই সুখচর গ্রামের উন্নতিকল্পে অকাতর পরিশ্রম করে অকালে কালের কবলে নিপাতিত হয়েছিলেন, তাঁরই নাম চিরদিন অক্ষুন্ন রাখবার জন্য এই এসোসিয়েশনের সভ্যদের ও গ্রামের অধিবাসীদের মতানুসারে গ্রন্থাগারের নাম ‘সুখচর শশধর পাঠাগার’ রাখা স্থির হয়। ফলে ১৯২৭ সালের ২১ আগষ্ট গ্রন্থাগারের নাম ‘ইয়ং মেন্‌স লিটারেরি এসোসিয়েশন’ এর পরিবর্তে ‘সুখচর শশধর পাঠাগার’ নামকরণ করা হল।

পাঠাগার সম্পর্কে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব অনেকেই উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছেন-

‘শশধর পাঠাগার দেখলাম অনেক দিনে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠান। পঠন পাঠন অধ্যায়ন না করলে সমাজকে গড়া যাবে না। জ্ঞান লাভ করতেই হবে। যেমন করেই পার। জ্ঞান বল, কর্ম বল তার সঙ্গে ত্যাগের বলে বলিয়ান হলে তবে মহৎ হতে পাড়বে, জাগো উঠে পড়ে লাগো। সকলের সঙ্গে মত মিলিয়ে বিদ্যা ও জ্ঞানের বাতি জ্বালাও।’ (বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, ০৯/০৫/১৯৪৮)

‘অদ্য সুখচর শশধর পাঠাগার পরিদর্শন করিয়া অত্যন্ত প্রীত হইলাম। পাঠাগারের পুস্তক তালিকায় অনেক মূল্যবান পুস্তক ও আছে দেখিলাম। লোক শিক্ষার বাহন হিসাবে এই রূপ পাঠাগারের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। পাঠাগারের যুবক কর্মীগণের উৎসাহ ও শিক্ষা আশা জনক। আমি এই পাঠাগারের উত্তরোত্তর উন্নতি কামনা করি।’ সমরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, উপমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গ, ২৩/০৪/১৯৫৫; শ্রী ফনীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ২৩/০৪/১৯৫৫, সম্পাদক/ভারতবর্ষ)

‘পঞ্চাশ বছর বয়স হয়েছে বলেই ঐতিহ্যের গৌরবে শশধর পাঠাগারে বার্ধক্যের পরিবর্তে নব যৌবনের জোয়ার আসা উচিৎ।’ (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ২১/১০/১৯৫১)

‘সুখচর শশধর পাঠাগারে গ্রন্থ সংগ্রহ দেখে আনন্দিত হলাম। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৫০ বছরের ঐতিহ্য জড়িত এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিস্তারের কাজে শশধর পাঠাগার পরম সহায় হয়ে উঠুক এই কামনা করি। (নরেন্দ্রনাথ মিত্র, ৩০/০৬/১৯৫৬)

শশধর পাঠাগারে আসিয়া পরম আনন্দ লাভ করিলাম। সুখচরের অনবদ্য কীর্তি এই পাঠাগার। আরও উন্নতি করুক এই কামনা করি। (বনফুল, ২২/০৯/১৯৭৪)।

সুখচরের গর্ব ডাঃ গোপালচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পিতার নাম ডাঃ নীলমাধব চট্টোপাধ্যায়। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত প্রণীত সংসদ বাঙ্গালী চরিতাভিধাপে ডাঃ গোপালচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে ১৮৭৩ সালে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষক ও সমাজসেবী। তিনি কলিকাতা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি ও ব্যাকটিরিওলজির সহকারী অধ্যাপক ও পরে সরকারের সহকারী ব্যাকটিরিওলজিষ্ট হন।  ১৯১৭ সালে কালাজ্বরের মৌলিক গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হন। ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্ণা সম্পর্কেও তিনি গবেষণা করেন। বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি সমাজসেবার জন্য সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ অ্যান্টি ম্যালেরিয়া সোসাইটি গঠন করেন। সারা বাংলায় এর শাখা বিস্তার করেন এবং সোসাইটির মুখপত্র ‘সোনার বাংলা’ সম্পাদনা করেন। মৎসচাষ ও নদী সংস্কার বিষয়ে মুল্যবান প্রবন্ধ রচনা ও স্বগ্রামে কুটীর শিল্প সমিতি স্থাপন করেন। বিজ্ঞানচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডনের রস ইনষ্টিটিউটের ফেলো নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ১২ বছর পানিহাটির পৌরসভার কমিশনার ছিলেন। উল্লেখযোগ্য রচনাবলী ‘রোমান্স অব দ্য গ্যাঞ্জেটিক ডেলটা’, মর্ডান সায়েন্টিফিক অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কো-অপারেটিভ ওয়াটার সাপ্লাই’ এবং ‘কো-অপারেটিভ মার্কেটিং, ডেয়ারিং হোম ক্রাফটিং অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাসট্রি’।

#

আঞ্চলিক গ্রামরক্ষী বাহিনী

সুখচর ঘোষপাড়া, উঃ ২৪ পরগণা

কলকাতা - ৭০০১১৫

Designed by © DRS Tech